বুধবার, ১১ মার্চ, ২০১৫

ব্যাঙের রাণী (মেক্সিকোর উপকথা)

এক রাজার দুই ছেলে ছিল। আর তাঁদের মধ্যে একজনের বিয়ে ঠিক হয়ে গেছিল। কার সাথে, না এক সুন্দরী রাজকুমারীর সাথে। একদিন ছোট রাজকুমার তার প্রাসাদের বাগানে একটা পুকুরে তার পোষা গাধাকে জল খাওয়াতে নিয়ে গেছিল। ঠিক তখনই তার সাথে দেখা হল এক ব্যাঙ্গের রাণীর। রাণীর তো রাজকুমারকে দেখে খুব পছন্দ। রাণি তাঁকে বলে যে সে রাজকুমারকে বিয়ে করতে চায়। রাজকুমার রাজী বিয়ে করতে।

কিন্তু বিয়ে তো অনেক খরচের ব্যপার, তাই রাজকুমার গেল তার বাবার কাছে। গিয়ে বলে আমি ব্যাঙ্গের রাণিকে বিয়ে করব, আমাকে কিছু টাকা পয়সা দাও। রাজা তো অবাক। এটা কি বলে তার ছেলে। শেষকালে ব্যাঙ্গের রানিকে বিয়ে করবে। কি আর করা যায়। যাকগে তার যাকে ভাল লাগে তাকেই বিয়ে করুক। এই ভেবে দিয়ে তো দিলেন দরকার মতন কিছু টাকা। বিয়ে তো হয়ে গেল দুজনের।

 তখন রাজা মশাই বললেন যে দুই বউইয়ের মাঝে কাকে ভাওল দেখতে তা বিচার করবেন। বলে দিলেন দুজনাকেই ভাল ভাল জামা কাপড় পড়িয়ে তার সামনে হাজির করতে, যাতে তিনি ঠিক করতে পারেন কে বেশী সুন্দর। সেজন্য রাজামশাই তাঁদের দুজনাকেই একটা করে পাখি আর একটা সুন্দর দেখতে কুকুরও উপহার হিসাবে দিলেন। কিন্তু রাজকুমারদের ওখান থেকে আলাদা করে রেখে গেলেন তার ছেলেদের বউদের দেখতে।

দেখা হয়ে যাবার পরে তার পরে সবাই বসলেন খেতে। খাওয়া শেষ হবার পরে রাজামশাইয়ের একটু নাচবার ইচ্ছেও হল। তিনি বললেন তাহলে বড় বউয়ের সাথে প্রথমে নাচা যাক। সুরু হল নাচ। কিন্ত এর মধ্যে ঐ যে ব্যাঙ রাণি ছিল, সে এসে খাবার টেবিল থেকে কিছু হাড় নিয়ে মন্ত্র পড়তে শুরু করে দিলে, বড় বৌ সেটা দেখতে পেয়ে ঠিক করে ফেলল যে সেও তাহলে ছোট বউয়ের নাচের সময় এই মন্ত্র পড়ার কাজটা করবে।

এবার রাজামশাই যখন ব্যাঙের রাণীর সাথে নাচ শুরু করলেন তখন ছোট বৌ তার ঐ মন্ত্র পড়া হাডগুলোকে এক এক করে মাটীতে ফেলতে লাগল, আর ফেলার সাথে সাথেই সেগুলি সোনার হয়ে যেতে লাগল। এই দেখে বড় বৌও তার সেই মন্ত্রপড়া হাড মাটীতে ফেলতে গেলে সেই হাড় গিয়ে লাগল ছোট বউয়ের মাথায়। তার পর ছোট বৌ গেল মরে। ভালই হল, কেন না ছোট বৌ মানে ঐ ব্যাঙের রানী ছিল এক ডাইনী।

from Spicydilip http://ift.tt/1wYA6xU

via IFTTT

সোমবার, ৯ মার্চ, ২০১৫

বাদরের বাঁদরামো (সাওতালী উপকথা)

একটা সময়ের কথা বলছি যখন এক বাগানে অনেক রকমের ফল নিজের থেকেই হত আর জঙ্গলের সমস্ত জন্তু জানোয়ারেরা মনের সুখে সেগুলো খেতে পারত। কিন্তু সেটা তারা পারত একটা শর্তে। তাঁদের গিয়ে ঐ গাছের কাছে নমস্কার করে, মাথা ঝুকিয়ে বলতে হত, “ হে অমুক গাছ, আপনি কি আমাকে দয়া করে আপনার ফলের একটু স্বাদ নিতে দেবেন”। 
খেয়াল রাখতে হত যে, তারা গাছের নাম ঠিক করে বলছে, আর ঐ দয়া করে কথাটা অতি অবশ্যই বলেছে। এটাও মনে রাখতে হত যে হ্যাংলামো করে অনেক ফল পেড়ে নিয়ে নষ্ট যেন না করা হয়। তাঁদের আম খাবার ইচ্ছে হলে আম গাছের কাছে গিয়ে বলতে হত, “ ও ভাই আম গাছে , তুমি কি দয়া করে একটা আম আমাকে খেতে দেবে”। বাস। অমনি আমগাছ থেকে একটা ভাল দেখে পাকা মিষ্টি আম, তার সামনে পড়ত, আর সেটা সে খেতে পারত। 
এখন সেই বাগানের এক পাশে একটা সুন্দর দেখতে গাছ ছিল, আর তাতে সুন্দর সুন্দর দেখতে কিছু ফল হয়েছিল। কিন্তু সেই ফল কেউই খায় নি। কেন না ঐ গাছটার নামই তো কেউ জানত না। আর নাম না জানলে গাছটাকে কি নামে ডাকা হবে। 
ঐ বাগানেরই এক পাশে একটা ছোট্ট কুড়েঘরে এক বুড়ী থাকত। যদি কোন জানোয়ার কোন গাছের নাম না মনে করতে পারত, তবে তার কাছে গিয়ে জেনে আসত। বাগানে যত গাছ ছিল বুড়ী তাঁদের সব গাছগুলোর নাম জানত। এই গাছের নামও বুড়ি জানত। হলে কি হবে, গাছের নামটা এত লম্বা আর খটমট যে জানোয়ারেরা ঐ নামটা শুনে সেই বুড়ির বাড়ি থেকে গাছ পর্যন্ত আসতে আসতেই নাম ভুলে যেত আর গাছের কাছে ফল চাওয়া হত না।  ঐ বাগানে একটা বাঁদর থাকত। সেই বাঁদর আবার গীটার বাজিয়ে গানও গাইত। জন্তু জানোয়ারেরা তার গান শুনতে খুব ভালবাসত। এইবার সেই বাঁদরের ইচ্ছে হল যে ঐ নাম না জানা গাছের ফল খায়। গেল সে বুড়ীর কাছে গীটার বগলে করে। আর বুড়ীর কাছে ঐ গাছটার নামও জেনে নিল, তার পরে সেই নামটাকে নিয়ে একটা গান বানিয়ে ফেলল। গীটার বাজায় আর সেই গানটা গায়, যাতে নামটা না ভুলে যায়। জন্তু জানোয়ারেরা জিজ্ঞেস করে এটা আবার কি গান গাইছে। কিন্তু বাঁদর কোন উত্তর দ্যায় না খালি গেয়ে চলে আর সেই গাছটার দিকে হেটে। 
গিয়ে পৌঁছল সেই গাছের কাছে। কি রকম সুন্দর ফলটা দেখতে। সে কোন রকমে এটুকু মনে রেখেছিল তাঁকে নামটা দুবার বলতে হবে আর দয়া কোরে এই কথাটাও যেন বলা হয়। বাঁদর সে কথা একেবারে ভোলে নি। তাই ঠিক মত বলে দিতেই গাছ তার একটা ফল বাঁদরের সামনে দিয়ে দিল। বাঁদর সেটাকে তুলেই এক কামড়। আর তার পর ওয়াক ওয়াক থু থু।, কি বিচ্ছিরী খেতে রে বাবা। ফলের বাকীটা সে ছুঁড়ে প্রায় বাগানের বাইরে ফেলে ছিল। কিন্তু বাঁদরের বাঁদড়ামো এবার সুরু হল। সে ভাবে একা সে কেন এই বাজে স্বাদের ফল খাবার শাস্তি পায়।
 তার পর থেকে কোন না কোন জানোয়ারকে ধরে তাঁকে ঐ সুন্দর দেখতে ফলটা খাওয়াত। আর তারা যখন সেই বিশ্রী ফলটা খেয়ে মুখ ব্যাঁকাত তখন বাঁদর খুব মজা পেত। সেটাই তার বাঁদরামো ছিল।

from Spicydilip http://ift.tt/1wYA6xU

via IFTTT


রবিবার, ৮ মার্চ, ২০১৫

বাঘের গায়ে দাগ কি করে হল (বর্মা দেশের রূপকথা)


কোন এক সময়ে এক জঙ্গলে এক বিরাট বাঘ থাকত। আর তার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু ছিল এক খরগোস। তখন কিন্তু বাঘের গায়ে ডোরাকাটা দাগ থাকত না। সুন্দর একেবারে সোনার রঙ ঝলমল করেছে। এদিকে খরগোস ভায়া ছিল ভীষন দুষ্টু। সবার সাথে ইয়ার্কি মারে। একে ক্ষেপায়, ওকে ক্ষেপায়, মানে একেবারে দুষ্টুর শিরোমণি। আর তাই এই খরগোসের কোন বন্ধু ছিল না। সবাই তাঁকে এড়িয়ে চলে। একা এই বাঘই তাঁকে বন্ধু হিসাবে মেনে নিয়েছিল। তাও যখন দেখে যে বেচারী খরগোসের কোন বন্ধু নেই। আর এমনিতে ভোলাভালা বাঘ, তার পেছনে তাঁকে নিয়ে কেউ মস্করা করছে কিনা, তার খেয়াল রাখত না। এমন সময় একদিন খরগোস এল বাঘের সাথে দেখা করতে। কি ব্যপার? খরগোস বাঘকে বলে, “বন্ধু, কাল আমাকে তুমি একটু সাহায্য করতে পারবে? বর্ষাকাল তো এসেই গেল, আমার ঘরের ছাতটাকে নতুন করে ছাইতে হবে। তাই কিছু খড়ের দরকার। তুমি আমাকে সাহায্য করলে, খড় কাটার পুরো কাজটা একদিনেই হয়ে যাবে”। বাঘ ভায়ার খেয়াল নেই যে খরগোস থাকে তো গর্তে। তার কোন ঘর বানানর কিসের দরকার? সে খুসী মনে বলে দিল, “ঠিক আছে, আমি তোমার সাথে কাজে যাব”। খরগোস বলে, “আমাদের ঐ বড় জঙ্গল পেরিয়ে যেতে হবে, অনেকটা পথ। সক্কাল সক্কাল বেড়িয়ে পরব। সাথে খাবার নিত ভুল করো না যেন”। পরের দিন সক্কাল বেলায় দুজনে রওয়ানা হয়ে গেল। খরগোস চড়ল বাঘের পিঠে। আর হাল্কা হবার জন্য বাঘ বুঝতেও পারল না যে খরগোস তার পিঠে বসে আছে। খরগোসের কাছে দুটো খাবারের প্যাকেট। একটাতে খরগোসের আনা একটা প্যাকেট যাতে আছে কিছুটা গোবর আর বালি মেশান। আর ওদিকে বাঘ ভায়া দুজনের পছন্দ মতন ভাল খাবারই এনেছে। জায়গা মতন পৌছনোর পরে বাঘ তো কাজে নেমে পড়ল। এদিকে খরগোস বললে , সে খুব ক্লান্ত হয়ে গেছে তাই একটু বিশ্রাম না নিয়ে কাজে লাগতে পারছে না। বাঘ ভায়ার কিন্তু খেয়াল এল না যে খরগোস সারাক্ষণ তার পিঠেই চড়ে এসেছে, তাই তার ক্লান্ত হবার কোন সম্ভাবনা নেই। যতক্ষণ বাঘ ভায়া তার কাজ শেষ করছে ততক্ষনে খরগোস বাঘের আনা খাবারটা খেয়ে নিয়ে খালি ঐ গোবর আর বালি মেশান প্যাকেটটা রেখে দিল। বাঘ ভায়া কাজ সেরে এসে খেতে বসলে, খরগোস বলে, “পুরাকালে জ্ঞানী ব্যক্তিরা বলে গেছেন যে যারা ঠিক সময়ে খেতে আসেনা তাঁদের খাবার বালি আর গোবর মেশান হয়ে যায়”। বাঘ তার খাবার খেতে পারল না কিন্তু ভাবতে লাগল সত্যি পুরাকালে লোকেরা কত কি জানত। সন্ধ্যের মধ্যে বাঘ ভায়া দুটো বিরাট বড় খড়ের আঠি কেটে তৈরী করে নিল, যাতে দুটোকে নিয়ে যাওয়া যায়। তার পরে দুটো আটিই বাঘ তার ঘাড়ে তুলে ফেরার জন্য হাঁটা দিল। খরগোসকে অত বড় আটির নীচে দেখা যাচ্ছিল না বলে সে কখন বেরিয়ে এসে কিছু না নিয়েই রওয়ানা হল। রাস্তায় খরগোস হঠাত ফস করে দেশলাই জ্বেলে নিতে বাঘ ভায়া জিজ্ঞেস করে কিসের আওয়াজ হল খরগোস ভায়া।। খরগোস বলে আমার খুব ঠান্ডা লাগছে মনে হচ্ছে সারাদিন রোদে থেকে জ্বর এসেছে। এই বলে সে একটা আঁটিতে আগুন লাগিয়ে নিয়ে লাফ মেরে জঙ্গলের ভেতরে লুকিয়ে পড়ল। বাঘ ভাবে খরগোসের নিশ্চয় খুব জ্বর এসেছে তাই তার ঠান্ডা লাগছে, কিন্তু আমার তো বেশ গরম লাগছে। ইতিমধ্যে তার পিঠে যে আঁটীটা ছিল সেটার আগুনের তাপ তার গায়ের চামড়াতে এসে পৌছলে, সে দেখে তার গায়ের চামড়াতে দাগড়া দাগড়া হয়ে পুড়ে দাগ হয়ে গেছে। সে চিৎকার করে আঁটীটা ফেলে দিয়ে লাফাতে শুরু করে দিল। ঠিক তখনই খরগোস এসে তার সামনে দাড়ালে, বাঘ খুব রেগেমেগে জিজ্ঞেস করে, আমার পিঠের আঁটিটাতে কেন তুমি আগুন লাগালে। খরগোস বলে, “আমি কোথায় আগুন লাগালাম। আমি তোমাকে এই প্রথম দেখছি”। বাঘ বলে, “সকালে আমরা এক সাথে এসেছিলাম, আর তুমি বলছ আমাকে এর আগে দেখইনি”। খরগোস বলে, “আরে ওতো আমার পিসিমার ননদের বৌদির ভাইপো হবে। দেখতে আমাদের প্রায় এক রকমের”। বাঘ আর কি করে। কাছের নদীতে ডুবকী লাগিয়ে তার গায়ের জ্বলুনী থামাল। সেই থেকেই বাঘের গায়ে ডোরা কাটা দাগ হয়ে গেছে।

from Spicydilip http://ift.tt/1wYA6xU

via IFTTT

বৃহস্পতিবার, ৫ মার্চ, ২০১৫

নেকড়ে, শেয়াল আর ভেড়ার গল্প (দক্ষিণ আফ্রিকার উপকথা)


এক নেকড়ে একদিন তার শিকার থেকে ফেরার সময় সামনে দেখে এক খামার বাড়ি আর সেখানে কিছু ভেড়ারয়ে গেছে। এই নেকড়ে কিন্তু আগে কোনদিন ভেড়া দেখে নি। কাজেই ভেড়ার মোটাসোটা চেহারা দেখে একটু নরম হয়েই তাঁকে গিয়ে জিজ্ঞেস করে, “আজ্ঞে সুপ্রভাত মশাই,আপনি কে হে ভাই। আপনার নামটা কি বলুন না”? ভেড়ার গলার আওয়াজ এমনিতেই একটু বেশি মোটা আর সে তার গম্ভীর গলায় বল্লে, “আমার নাম হচ্ছে ভেড়া। আর তোমার নামটা কি”? কিন্তু এই কথাগুলো জিজ্ঞেস করার সময় ভেড়া তার সামনের পা দুটো বেশ একটু উচু করেই রেখে কথা বলছিল, যাতে মনে হয় এইবার মাথা দিয়ে গুঁতিয়েই দেবে, নেকড়ে এই ভেড়ার গম্ভীর গলার আওয়াজ শুনে বেশ একটু ভয় পেয়ে গেল আর নিজের পরিচয় হিসাবে কোন রকমে “আমি নেকড়ে” এই কথাটুকু বলে পড়ি কি মরি করে পালাল। এখন এই নেকড়ে যে জঙ্গলে থাকত, সেখানে এক শেয়ালও থাকত। হাঁফাতে হাঁফাতে নেকড়ে গিয়ে শেয়ালকে বলে, “ও শেয়াল ভায়া, আজ আমি একটা ভয়ানক ধরনের জানোয়ার কে দেখেছি। কি তার গলার আওয়াজ, আমি তো ভাই, ভয়ের চোটে পালিয়ে এসেছি । নাম জিজ্ঞেস করলাম তো বলে আমি ভেড়া”। শেয়াল বলে, “ভায়া তুমি একটা বুদ্ধু, ভেড়ার মাংস তুমি কি আগে খাওনি। ঠিক আছে, কাল আমরা দুজনে গিয়ে ওটাকে মেরে ভাল ভাবে মাংস খাব”। কিন্তু নেকড়ে যেতে ভয় পাচ্ছে দেখে বলে, “ঠিক আছে একটা দড়ি দিয়ে আমরা একে অন্যের সাথে বাঁধা থাকলে তো আর কেউ কাউকে ছেড়ে পালাবে না”। পরের দিন সকালে যখন ভেড়া তার সকালের জলখাবার খাচ্ছে তখন হটাত দেখে দূরে নেকড়ে আর শেয়াল দুজনে মিলে আসছে। ভেড়া তো ভীষণ ভয় পেল আর তার গিন্নী কে বললে, “গিন্নি আজ মনে হচ্ছে আমাদের শেষ দিন। আমাদের খেতে নেকড়ে আর শেয়াল দুজনে মিলে আসছে”। ভেড়া গিন্নী বলে, “চিন্তার কোন কারণ নেই, আমি সব কিছু ঠিক করছি। তুমি বরঞ্চ এক কাজ কর। আমাদের ছোট বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে একটু বাইরে থেকে ঘুরে হাওয়া খাইয়ে আন। আর হ্যাঁ, আমি তোমাকে ইশারা করলেই তুমি বাচ্চাটার গায়ে খুব জোরে একটা চিমটি কেটে দেবে। যাতে বাচ্চাটা কেঁদে ওঠে”। এদিকে শেয়াল আর বাঘ যখন কাছে এসেছে অমনি ভেড়া গিন্নী ইশারা করতেই ভেড়া তার বাচ্চাটাকে দিয়েছে এক চিমটি। আর বাচ্চাটা কেঁদে উঠেছে। তখন ভেড়াগিন্নী জোরগলায় বলে উঠল, “ঠিক আছে শেয়াল ভায়া। একেবারে ঠিক সময়েই নেকড়েটাকে ধরে এনেছ। দেখনা বাচ্চাটা খাবে বলে কাঁদছে। নিয়ে এস কাছে। বাচ্চাটাকে খেতে দিই”। নেকড়ে এই কথা শুনে ভাবে সত্যি বুঝি শেয়াল তাঁকে ধরে বেঁধে নিয়ে এসেছে ভেড়ার কাছে খেতে দেবে বলে। আর কি সে থাকে ওখানে। প্রাণপনে পেছন দিকে মারল ছুট। আর শেয়াল তো দড়ি দিয়ে নেকড়ের সাথে বাঁধা আছে। সে মাটিতে আছাড় খেয়ে, ঘষটে গায়ের ছালচামড়া ছিঁড়ে, নেকড়ের বাঁধনের সাথে চলল জঙ্গলের দিকে। একেবারে জঙ্গলের ভেতরে না যাওয়া পর্যন্ত নেকড়ে আর থামে নি। ভেড়া, তার গিন্নী আর বাচ্চা বেঁচে গেল।

from Spicydilip http://ift.tt/1wYA6xU

via IFTTT

সোমবার, ২ মার্চ, ২০১৫

কৃতজ্ঞতা (জাপানী রূপকথা)

 কোন এক সময়ে জাপানের হিতাচীতে নামইকাটা নামে একটা জায়গায় এক পন্ডিতমশাই থাকতেন। বয়স তার ছিল অনেক আর তার কোন ছেলেপিলেও ছিল না যারা তাঁকে খাবার তৈরী করে দেবে। পন্ডিতমশাই তার রান্নাবান্না নিজেই করে নিতেন আর দিন রাত মনদিয়ে প্রার্থনা করতেন, “ নামু আমিদা বুতসু “ মানে হচ্ছে, ওম মনিপদ্মে হুম। কাছের গ্রামের লোকজনেরা তাঁকে খুব শ্রদ্ধা করত আর শাক সব্জী, কলাটা মুলোটা দিয়ে যেত। এমনকি তার ঘরের মেরামতীর দরকার পড়লে তারাই এসে সেটা করে দিত। এক শীতের রাতে যখন বাইরে খুব ঠান্ডা পড়েছে, তখন পন্ডিতমশাই শুনলেন কে যেন তাঁকে বাইরে ডাকছে, “পন্ডিতমশাই, পন্ডিতমশাই”। উঠে দরজা খুলে দেখেন বেজীর মতন একটা জন্তু দরজাতে দাঁড়িয়ে আছে। নাম তার ছিল ব্যাজার। রাতবিরেতে এই রকম একটা জন্তুকে দরজাতে দেখলে লোকে সাধারনত ভয় পাবে, কিন্তু পন্ডিতমশাই ভয় পেলেন না। বরঞ্চ জিজ্ঞেস করলেন কি চাই তার। ব্যাজার বলে, “প্রভু আমি এতদিন পাহাড়ে থাকতাম কিন্তু এখন বয়স হয়েছে ঠান্ডায় বড্ড কষ্ট পাচ্ছি। আপনি যদি দয়া করে আমাকে আপনার ঘরে একটু জায়গা দেন আর আপনার ঘরের একটু আগুন পোহাতে দেন, তবে আমি একটু গরম থাকতে পারি”। পন্ডিতমশাইয়ের দয়া হল, আহারে বেচারা ঠান্ডায় কষ্ট পাচ্ছে। তাই বললেন, “এটা আর কি এমন কথা। চটপট ঘরে ঢুকে এস, আর আগুনের পাশে বসে যাও”। ব্যাজার ঠিক এই রকম আশা করেনি। তবুও পন্ডিতমশাই বলামাত্র সে ঘরে ঢুকে এল আর আগুনের পাশে বসে গেল। পন্ডিতমশাই দরজা বন্ধ করে লেগে গেলেন আবার প্রার্থনা করতে। ঘন্টা দুয়েক বাদে ব্যাজার যখন বুঝতে পারল যে তার গা বেশ গরম হয়ে গেছে তখন সে পন্ডিতমশাইয়ের কাছ থেকে বিদায় নিল। তার পর থেকে সে রোজই রাতে পন্ডিতমশাইয়ের ঘরে আসতে শুরু করে দিল। আসার সময় ব্যাজার কিছু শুখনো ঘাস পাতা আগুনের জন্য নিয়ে আসত। এটা পন্ডিতমশাইয়ের অভ্যাসে মধ্যে দাঁড়িয়ে গেছিল। যদি কোনদিন ব্যাজারের আসতে দেরী হত তো পন্ডিতমশাই ভাবতে থাকতেন কেন এত দেরী হচ্ছে। শীত চলে গেলে বসন্তকাল এসে পড়ল আর তখন ব্যাজার পন্ডিতমশাইয়ের কাছে আসা বন্ধ করে দিল। কিন্তু আবার ঘুরে শীত পড়তেই ব্যাজার এসে হাজির। আবার সেই আগের মতন ব্যাজার রোজ রাত্রে এসে পন্ডিতমশাইয়ের কাছে থাকে। এভাবে দশ দশটা বছর কেটে গেল। ব্যাজার বলে, “পন্ডিতমশাই আপনার দয়ায় তো আমার শীতগুলোতে কোন কষ্ট হয়নি। কিন্তু আপনার এই উপকারের বদলে আমি কি করতে পারি। আপনি বললে পরে সেটা না হয় আমি চেষ্টা করে দেখব”। পন্ডিতমশাই বলেন, “নারে ভাই, আমার কাছে তুমি বরাবর এই রকম ভাবে প্রতি শীতে আস সেটাই আমার সবচেয়ে ভাল লাগবে”। প্রত্যেক বছরই ব্যাজার পন্ডিতমশাইকে এই ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে। শেষে এক দিন পন্ডিতমশাই বললেন, “দেখ ভাই। আমি তো সারাদিন প্রার্থনা করেই কাটাই, আর আমার জন্য প্রত্যেক দিনে যা যা দরকার, তা তো গ্রামের লোকেরাই আমাকে দিয়ে যায়। তাই বিশেষ কিছুর দরকার আছে বলে তো মনে হয় না। হ্যাঁ, তবে তুমি যখন এত কথা বলছ, তখন যদি আমাকে তিন রিয়ো সোনা দিতে পার তবে ভাল হয়। মানে আমি তো বুড়ো হয়েছি, যে কোনদিন মারা যেতে পারি। এখন ঐ তিন রিয়ো সোনা আমি যদি কোন মন্দিরে দান করি, তবে তারা আমার নির্বাণের জন্য ভাল করে প্রার্থনা করবে”। পন্ডিতমশাই যতক্ষণ এই কথাগুলো বলছিলেন ততক্ষণ ব্যাজার কে বেশ চিন্তিত দেখাচ্ছিল। তাই দেখে পন্ডিতমশাই বললেন, “যাকগে, তোমায় এ নিয়ে চিন্তিত হতে হবে না কেননা নির্বাণের পথে যাচ্ছি যখন, তখন আমার হয়ে কেউ প্রার্থনা করে কি না করে তাতে কিছু এসে যায় না”। কিন্তু তার পরে ব্যাজার আর আসে না। পন্ডিত মশাই ভাবেন কি হল রে বাবা, নিশ্চয় টাকা জোগাড় হয়নি বলে আসছে না, আর নয়ত টাকা জোগাড় করতে গিয়ে কিছু দুর্ঘটনা হয়ে বেচারা মারা গেছে। এই ভাবেন আর নিজের উপরে রাগ করেন যে কেন তার ঐ সোনার কথা বলতে গেলেন। আর বেশী করে ব্যাজারের জন্য প্রার্থনা করতে থাকেন। এই রকম ভাবে তিন তিনটে বছর কেটে গেল। হঠাত এক রাতে পন্ডিত মশাই একটা ডাক শুনতে পেলেন, “গুরুদেব, ও গুরুদেব”। গলার আওয়াজ ব্যাজারের মতো লাগছে মনে হল। আনন্দে পন্ডিত মশাই এক লাফে উঠে দরজা খুলেই দেখেন সত্যি তো ব্যাজার দাঁড়িয়ে আছে। তিনি আনন্দে বলে উঠলেন, “কোথায় ছিলে এত দিন। এদিকে আমি চিন্তায় মরি তোমার কিছু বুঝি হল”। ব্যজার ঘরে ঢুকে বলে, “গুরুদেব, আপনি আমাকে যে সোনার কথা বলেছিলেন সেটা যদি কোন অসৎ কাজের জন্য হত তবে তো আমি যে কোন জায়গা থেকে চুরি করে আনতে পারতাম। কিন্তু যখন আপনি বললেন যে ওটা কোন মন্দিরে দেবেন, তখন আমি ভাবলাম চুরি করে তো কোন মহৎ কাজ হবে না। তাই আমি চলে গেছিলাম সাডো দ্বীপে। সেখানে খনির মজদুরেরা যে সমস্ত মাটী আর বালি খুঁড়ে সোনা নিয়ে বাকিটা ফেলে দ্যায় সেই গুলোকে গালিয়ে তার থেকে কিছু কিছু করে সোনা বার করেছি। সেই জন্যই এত দেরী হয়ে গেল”। এই বলে একটা কাপড়ের পুটুলী খুলে পন্ডিত মশাইকে দেখাল। হ্যাঁ সত্যি তো সোনাই দেখা যাচ্ছে। পন্ডিতমশাই সেটাকে তুলে নিয়ে বললেন, “তাহলে সত্যি তুমি আমার একটা কথার জন্য এত কষ্ট করলে, তোমাকে যে আমি কি বলব তা ভেবে পাচ্ছি না”। ব্যাজার বলে, “গুরুদেব, আমি আমার কর্তব্য করেছি, ওটা তো আমার করা উচিতই ছিল। দয়া করে একথা আপনি আর কাউকে বলবেন না”। পন্ডিত মশাই কথাটা শুনে বললেন, “কিন্তু না বলে তো থাকা যাবে না। কারণ আমার ঘরে এটা রাখলে পরে চোরে চুরি করে নিতে পারে। আর যদি মন্দিরে এখন দিই তবে লোকে ভাববে কোথা থেকে এই পন্ডিত ভিখিরীর এত টাকা হল যে সোনা দান করছে। অবশ্যি আমি বলতে পারি যে আমাকে তুমি দিয়েছ। তাতে একটা বিপদ হতে পারে যে তোমার উপরে লোকে হামলা করবে। তবুও যতদিন আমি বেঁচে আছি, ততদিন তুমি মাঝে মাঝে এসে আমার সাথে দেখা করে যেও”। তার পর থেকে যতদিন পন্ডিতমশাই বেঁচে ছিলেন, ততদিন ব্যাজার প্রতি শীতে তার ঘরে এসে রাত কাটাতেন। কিন্তু তোমরা এর থেকে কি শিখতে পারলে, দেখলে তো একটা জন্তুও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার ইচ্ছে আর ক্ষমতা রাখে।

from Spicydilip http://ift.tt/1wYA6xU

via IFTTT

রবিবার, ১ মার্চ, ২০১৫

আমার দেখা সত্তরের দশক (৬)

ইতিমধ্যে আমার আবার ট্রান্সফার হবার সময় এসে গেল। মানে চার বছর এক জায়গাতে রয়ে গেছি আর কি কারুর সহ্য হয়। পাঠান হল আমাকে বিশাখাপত্তনমে বা রেলের ভাষায় ওয়াল্টেয়ারে। সেটা হল ৭৭ সালের মার্চ নাগাদ। গিয়ে দেখি আমার পূর্বসুরী, রেলের চাকরী ছেড়ে বেসরকারী কোম্পানিতে যোগ দিচ্ছেন, আমাকে তার জায়গা নিতে হবে। কাজ হচ্ছে লোহার আকর জাপানে রপ্তানী করার জন্য যে কোত্তাভালাসা-কিরুন্ডুল লাইন তৈরী হয়েছিল সেটার বৈদ্যুতিকরণ।

এই লাইনটার একটা বিশেষত্ব ছিল। পুর্বঘাট পর্বতমালা (অনন্তগিরি রেঞ্জ) পার হয়ে এটা উড়িষ্যার ভেতর দিয়ে মধ্যপ্রদেশের বাস্তার (বর্তমানে ছত্তিশগড়ে) এলাকায় কিরুন্দুলের বৈলাডিলা পাহাড়ের লৌহআকর রপ্তানীর জন্য তৈরী করা হয়েছিল। সাধারণত পাহাড়ী এলাকাতে রেলের লাইন পাতার কাজে ছোট গেজ (ন্যারো) এর প্রয়োগ করা হয়, কিন্তু এখানে বড় সাধারণ (ব্রড) গেজের ব্যবহার করা হয়েছিল কারণ এক সাথে অনেক মাল বহন করা যাবে।

ওয়াল্টেয়ার আর ভিজিয়ানাগ্রামের মাঝামাঝি জায়গা কোত্তাভালাসা থেকে এই লাইনটা পাহাড়ের দিকে ঘুরে গেছে। আর কিছুটা যাবার পরেই আসে শৃঙ্গভরপুকোটা বা রেলের ভাষায় এস কোটা। এখান থেকে আরাকূ পর্যন্ত পাহাড়ী রাস্তা, তার পরে কোরাপুট পর্যন্ত প্রায় সমান জমি। কোরাপুট পার হবার পরে অল্প কিছুটা পাহাড় বেয়ে লাইন নীচে নেমেছে তার পরে মধ্যপ্রদেশের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে জগদলপুর হয়ে দান্তেওয়ারা হয়ে কিরিন্দুল পৌঁছেছে।

আরাকু আসার আগেই রাস্তায় পড়ে বোড়াগুহালু ষ্টেশন। একটু দূরে বোড়া গুহা। এক বিরাট গুহা যাতে উপর থেকে জল চুইয়ে পড়ে চূনাপাথরের স্তম্ভ সৃষ্টি করেছে, নাম বৈজ্ঞানিকদের ভাষায় ষ্ট্যালাকটাইট আর ষ্ট্যালাগমাইট। লোকে শিবলিঙ্গ ভেবে পূজোআচ্চাও করে। পরে পড়বে মাচকুন্ডের বাঁধ, আর তার কাছেই কিছু পুর্ব বাংলার বাস্তুহারাদের কলোনি, কোরাপুটের কাছে সুনাবেড়াতে হিন্দুস্তান এরোনটিক্সের কারখানা। কোরাপুট পার হবার পরে বড় জায়গা আসে জগদলপুর।

জগদলপুরের আগে আসে মালিগুড়া রেঞ্জ ফরেষ্ট। সন্ধ্যের পরে যদি রাস্তা ধরে গাড়ীতে এই জঙ্গল পার হওয়া যায় তবে বাঘ দেখার সম্ভাবনা আছে। আমি বাঘ দেখতে পাই নি কিন্তু নীলগাইকে কিছু হিংস্র জন্তু তাড়া করায় সে দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে রাস্তা পার হচ্ছে দেখেছি। রেলের লাইনের আশপাশে তো ভাল্লুকের আনাগোনা লেগেই থাকত। আমি নিজেও ভাল্লুক দেখছি। জগদলপুর পার হবার পরে আসে গিদাম, দান্তেওয়ারা যেখানে সেই অবুঝমারের জঙ্গলের ভেতর দিয়ে যেতে হয়। এখানে রেলের লোকেরা রাত লাইনে কোন কাজে  (যেমন সিগনালে আলো লাগানো) জানোয়ারের আক্রমণের ভয়ে যেতে চাইত না। বলা হয় এ জায়গা এখন মাওবাদীদের আস্তানা।

যদিও লাইনটা কিরিন্দুল পর্যন্ত গেছে লৌহ আকরের জন্য তবুও এই আকর পাওয়া যেত বাচেলী আর কিরিন্দুলের মাঝ থেকেই। বড় বড় রোটারী এক্সকাভেটর দিয়ে পাথর কাটা হচ্ছে আর তার পর তাকে নদীর জলে ধুয়ে মাটী সরিয়ে ফেলা হচ্ছে। নদীর জল এই ময়লা নিয়ে লাল হয়ে গেছে, মাছ আর পাওয়া যায় না, কিন্তু তার কোন খেয়াল নেই। বৈদেশিক মুদ্রা রোজগার হচ্ছেত। এই প্রসঙ্গে বলি, আজকাল জাপানে আর আকর রপ্তানী হয় না। সমস্ত আকর ভিশাখাপত্তনমে যে ইস্পাত কারখানা হয়েছে তাতে ব্যবহার করা হয়।

সাধারণত ব্রড গেজের লাইনের ঢাল (গ্রেডিয়েন্ট) প্রতি ১০০ ফুটে ১ ফিটের চেয়ে বেশি করা হয় না, এখানে প্রতি ৪০ ফিটে ১ ফিট ঢালে লাইন পাতা হয়েছে, যার ফলে  ৪০/৪২টা ৯০ টন আকর ভর্তি করার ক্ষমতার খালি ওয়াগনকে টানতে তিনটে ইঞ্জিন কোন রকমে পেরে উঠত। আর যখন মাল ভর্তি করে নামত, তখন ওয়াগনগুলো ঢালের মুখে পড়ে গতি পেলে ঐ তিনটে ইঞ্জিন লাগত তাদের টেনে ব্রেক করে রাখার জন্য।

লাইনে বাঁক ছিল অসংখ্য আর টানেল ছিল মনে হচ্ছে  ছিল ৫৮ টা। এই রকম ইঞ্জিনিয়ারিঙের একটা নিদর্শনে দুর্ঘটনাও হত আকচার। তা ছাড়া পুর্বঘাট পর্বতমালার পাহাড়ে বঙ্গোপসাগরের ঘুর্ণিঝড় প্রায়ই প্রচুর বৃষ্টিপাত করে ধ্বস নামিয়ে দিত, যার ফলে বর্ষাকালে ট্রেন চলাচল অনিয়মিত থাকত।

রেলের একটা নিয়ম আছে য্ত।কোন লাইন যদি ১০০০ মিটার পার করে, তবে তার পরের অংশটাতে যে সমস্ত কর্মচারী কাজ করেন তাঁদের পাহাড়ী ভাতা দিতে হয়। রাস্তায় কিছুদূর যাবার পরে একটা ষ্টেশন আসে শিমিলিগুডা। দেখা গেল লাইনের উচ্চতা হয়ে যাচ্ছে ১০০৪ মিটার।  এই ষ্টেশনের পরে লাইনটা কিন্তু নীচের দিকে নেমে গেছে এবং আগে কোথাও আর ১০০০ মিটারের উচ্চতা পার হয়নি। কিন্তু এই শিমিলিগুডা থেকে যেতে হবে আরও প্রায় ৩৫০ কিলোমিটারের মত।

তবে কি সেই সমস্ত ষ্টেশনের কর্মচারীদের ঐ পাহাড়ী ভাতা দিতে হবে। উপায় একটাই। ঐ শিমিলিগুডা ষ্টেশনের সমস্তটা আর দুপাশে আরও এক কিলোমিটারের মতন জায়গাতে পাহাড় কেটে ১০০০ মিটারের নীচে নামিয়ে আনা হল। ষ্টেশনের বাকী সব জায়গা, যেমন ষ্টেশন বিল্ডিং, ষ্টাফ কোয়ার্টার সব ১০০০ মিটারের বেশী উচুতে। কিন্তু যেহেতু লাইন আছে ৯৯৬ দশমিক কিছু মিটারে, তাই আর ভাতা দেবার দরকার পড়ল না।

আমার আইনত অফিস হল আরাকুতে, মানে ওয়াল্টেয়ার থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরে, কিন্তু যেহেতু সমস্ত সমন্বয়ের কাজ ওয়াল্টেয়ারে, তাই আমার অফিসের নাম হল আরাকু এট ওয়াল্টেয়ার, মানে আমি ওয়াল্টেয়ারে থাকব কিন্তু প্রায় একদিন বাদে বাদেই আমাকে লাইনে যেতে হবে। অসুবিধার মধ্যে যাতায়াতের জন্য প্যাসেঞ্জার ট্রেন ছিল দিনে একটি। সকালে ওয়াল্টেয়ার ছাড়ে, আরাকু পৌছতে লাগে পাঁচ থেকে ছ ঘন্টা আর ফেরার ট্রেন আরাকুতে রাত দুটোর সময়। সকাল আটটার পরে এসে ওয়াল্টেয়ারে পৌছবে।

আরাকু জায়গাটা অদ্ভুত, সারা দিনে তিনটে ঋতুকে উপভোগ করা যেতে পারে, সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ভ্যাপ্সা গরম, প্রায় গ্রীষ্ম কাল, বিকেলের দিকে বৃষ্টিতে বর্ষাকালের আনন্দ আর রাত পড়লেই ঠান্ডা, শীতকালের মত। সারা বছর রাতে গরম জামা পড়ে থাকতে হবে। আমার হল মুশকিল, ওয়াল্টেয়ার থেকে যখন বার হই তখন ওখানে বেশ গরম থাকে। অবশ্যি ওয়াল্টেয়ার সমূদ্রের ধারে হবার জন্য একমাত্র বর্ষাকালেই একটু ঠান্ডা বোধ হয়, নইলে বাকী সব সময় গরম। স্নান করে গা মোছা শেষ হতে না হতেই আবার মুছতে হয়, তবে এবার জল নয়, ঘাম।

লোকেদের কথ্য ভাষা তেলেগু। এর আগে শুনিইনি। বাসে নম্বর রোমান অক্ষরে কিন্তু গন্তব্যস্থল তেলেগু ভাষায় লেখা। বাসে কন্ডাক্টরের ভাষা তেলেগু। দোকানে কিছু জিনিষ কিনতে গেলে বিপদ, কি করে জিনিষের নাম বোঝাব? উপায় একটাই স্যাম্পল হাতে নিয়ে বাজারে যাওয়া। কিন্তু সব্জী কেনার বিপদ অনেক,  কায়লু আর পান্ডুর মধ্যে তফাৎ (মানে কাঁচা আর পাকা) বোঝাতে হবে। তবে বাজারে গেলে যেহেতু সব্জী চিনি, তাই কেনার সময় নামটা শুনে মুখস্থ করতে হত। মাছ কেনার সময় বিপদ ছিল, কেননা চপ্পল হল চপলু আর মাছ হল চ্যাপলু। দোকানীকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে কথাটা বলার চেষ্টা করা হত।

পাহাড়ী এলাকা কাঠাল গাছে ভর্তি ছিল, তবুও সাধারণ লোকে এঁচোড় (ওদিকের ভাষাতে পনসকায়) খেতে জানত না। মানে আমাদের মত গাছ পাঁঠা তৈরী করে খাওয়ার মেথডে। ওদের এঁচোড় খাবার মেথড ছিল খোসা বাদ দেবার পরে একেবারে সব শুদ্ধ কুচিকুচি করে কেটে রান্না করা। কলাগাছ থাকলেও থোড় বা মোচা, খাবার হিসাবে গণ্য হত না। আমার সহকর্মী, যে এস কোটাতে থাকত তার কাছে বলা ছিল যে কাঁচাকলার গাছ না হলে থোড় আর মোচা আমাকে পাঠাতে। মাসে এই রকম বার দুয়েক সাপ্লাই এসে যেত। লাউ খাওয়া হবে কিন্তু লাউডগা তো গরুর খাদ্য। 

ভাষা বিভ্রাটের আর একটা উদাহরণ দিচ্ছি। একবার আমার এক খালাসীকে বলেছি বস্তা করে গুল (মানে গুড়ো কয়লার ব্রিকেট, তখনও ওয়াল্টেয়ারে গ্যাসের সাপ্লাই চালু হয়নি) নিয়ে আসতে। এখন বোড়া হিন্দি মানে বস্তা,  কিন্তু তেলেগুতে বোড়া মানে মাথা বা বড়টা। গুল বদলে গেছে তার কাছে গুডলুতে মানে ডিমে। লোকটা অবাক, মাথা ভর্তি ডিম আনতে বলে কেন?

চিন্তা করতে হবে যে আমার অফিসে তখন প্রায় শ চারেকের মত লোক, ফিটার থেকে খালাসী মিলিয়ে ছিল আর তার মধ্যে অন্য ভাষাভাষী কেউ নেই। দোভাষির কাজে আমার দুই সহকারী তেলেগু ষ্টাফ, যারা খড়গপুরে বছর ছয়েক কাটিয়েছে। এরা দুজনে যদিও আরাকুতে থাকত, আর এত সুন্দর বাংলা বলত যে আমার কেন আমার এবং আমার ফ্যামিলির কারুর অসুবিধা হত না।

কিন্তু আমাকে এর রাস্তা খুঁজে বার করতে হল। প্রথমে সিনেমার পোষ্টার দেখে অক্ষর চেনা। তার পরে পেদ্দা শিক্ষা মানে বড়দের জন্য শিক্ষা বইটা জোগাড় করে পড়া, আর লোকেদের হুকুম দেওয়া যে আমাকে তারা তেলেগু ছাড়া অন্য কিছু (সাইন ল্যাঙ্গুয়েজও  না) বোঝানর জন্য ব্যবহার করবে না। ফল দিল। আমি তেলেগু বই পড়তে শিখে গেলাম আর কথাও বলতে। আজ অবশ্যি বছর ত্রিশ পয়ত্রিশ বাদে চর্চার অভাবে পড়তে পারিনা, কিন্তু ভাঙ্গা ভাঙ্গা বলতে পারি।


এই লাইনটা তৈরী করার সময় প্রজেক্টটা ছিল ডি বি কে (দন্ডকারণ্য, বোলাঙ্গীর কিরিবুরু) প্রজেক্ট নামে। ষ্টাফেদের জন্য একটা কলোনীও তৈরী ছিল। বাড়ীগুলো তৈরী ছিল পাথর দিয়ে, যাকে ইঞ্জিনিয়ারিং ভাষায় বলা হয় র‍্যান্ডম রাবল ম্যাসনারী। ছাদ থেকে জল চুইয়ে আসার সম্ভাবনা খুব থেকে যায়। প্রথমে আমার আস্তানা পাওয়া গেল এই রকম এক কোয়ার্টারে। আমি বিলাসপুর গিয়ে মালপত্র বুক করে এলাম আর বিশেষ খেয়াল রাখা হল যাতে ওয়াগন এসে পৌছয় তিন সাতেকের মধ্যে। মালপত্র পৌছলে তবে ফ্যামিলী নিয়ে আসা হবে। এবার আর মালপত্র এসে পৌঁছতে দেরি হয়নি।

আন তিয়েমের তরমুজ (ভিয়েতনামের রূপকথা)


অনেক দিন আগে ভিয়েতনামে হুং ভং নামে এক দয়ালু রাজা ছিলেন। তার একটাও ছেলে ছিল না। খালি একটাই মেয়ে। কি আর করে, ঠিক করে নিল যে একজন ছেলেকে দত্তক নেবে। দূরদেশ থেকে এক ছেলেকে সে দত্তক নিল। ছেলের নাম ছিল আন তিয়েম। ধীরে ধীরে আন তিয়েম বড় হয় আর সব দিক দিয়ে চৌখস ছেলে হয়ে ওঠে। যেমন বুদ্ধি তেমনি তার বিচার। রাজা মশাই খুব খুশী। কিন্তু তার মেয়েকেও তিনি কাছছাড়া করতে রাজী নন, তাই ঠিক করলেন যে আন তিয়েমের সাথে তার নিজের যে মেয়ে ছিল তার বিয়ে দিয়ে দেবেন। রাজামশাই চেয়েছেন আর বিয়ে হবে না? বিয়ে মহা ধুমধামের সাথে হয়ে গেল, আর তার পরে দুজনে মহা সুখেই দিন কাঁটাতে লাগল। কিন্তু রাজসভাতে কিছু না কিছু বদ লোক থাকবেই। তারা এই দুজনের নামে মিথ্যে মিথ্যে গুজব রটাতে শুরু করে দিল। কেননা তারাতো আর এঁদের ভাল চায় না। ক্রমে রাজামশাই এই সব গুজব শুনতে পেলেন। ভাবতে থাকেন তবে কি এগুলো সত্যি। তার মেয়েই তার বিরুদ্ধে যেতে চাইছে। আর আন তিয়েম, যাকে তিনি নিজের ছেলের মতন করে ভালবেসে ছিলেন সেও ঐ দলে আছে। বিশ্বাস হচ্ছেনা, কিন্তু তবু হলেও হতে পারে। তাহলে কি করা যায়। ঠিক করলেন আন তিয়েমকে নির্বাসন দেওয়া হোক। কোথায়, না বহুদূরের কোন এক নির্জন দ্বীপে। কবে যে নির্বাসনের সাজা মকুব হবে তা কজেউ জানে না।আন তিয়েমও কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিল না যে সে কোনদিন বেঁচে ফিরতে পারবে। আর ওদিকে আন তিয়েমের স্ত্রী মানে রাজামশাইয়ের মেয়ে যখন দ্বীপে গিয়ে সেই হুহু করে বয়ে যাওয়া ঝোড়ো হাওয়া দেখল আর তার ঝাপটা গায়ে অনুভব করল, সে তো কেঁদেই ফেলল। কি করে এই রকম জায়গাতে তারা থাকবে। কোন লোকজন নেই সাহায্য করার মতন কাউকে কোথাও পাওয়া যাবে না। ভেবে কি লাভ, যাকগে কি আর করা যাবে। কোন রকমে তার নিজেদের ধীরে ধীরে ওখানে থাকার জন্য তৈরী করে নিতে শুরু করল। একদিন আন তিয়েন সমূদ্রের পাড়ে দেখে কয়েকটা হলুদ রঙের পাখী ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। পাখীগুলোকে সে চেনে না, তাই ভাল করে দেখবার জন্য সে একটা উচু পাথরের উপর থেকে নজর রাখতে লাগল। দেখতে পেল যে কিছু কাল রঙের বিচি ওখানে পড়ে আছে আর পাখীগুলো তাতে ঠোকর মারছে আর খেয়ে নিচ্ছে। আন তিয়েম ঠিক করে নিল এই বীজগুলো নিয়ে সে কোথাও পুঁতে দেবে। তাতে তার তো ক্ষতি তো কিছু হবে না। আন তিয়েম তার বউকে বলল, “দেখ এই বিচীগুলো পাখী খাচ্ছিল। তারা যদি খেতে পারে তবে এর ফল আমরাও খেতে পারব”। পুঁতে দেবার কিছুদিন বাদেই দেখল যে বীজগুলো থেকে লতার মত গাছ হয়েছে, তাতে প্রথমে কুড়ি এল তার পরে ফুলও এল। আর সব শেষ এল ফল। গোল গোল ফল ক্রমে বড় হয়। দেখতে দেখতে সেই ফলগুলো তাঁদের মাথার মাপের চেয়ে বড় হয়ে উঠল, সবুজ রঙের গা, বেশ হাত বোলালে মসৃণ লাগে। ফলগুলোর থেকে সুন্দর গন্ধ বার হচ্ছে দেখে একদিন আন তিয়েম একটা ফল কেটে নিয়ে খাবার জন্য বাইরের খোলাটা ছাড়াল। ভেতরে লাল রঙ। আর কি মিষ্টি খেতে । ফলটার নাম আন তিয়েম দিল “দুয়া দু”। কিন্তু আন তিয়েমের বৌ বলে, শোন শোন পাখীগুলো কি বলছে। আন তিয়েম পাখীর ডাক শুনে বলল, ওরা তো বলছে “তে কুয়া, তে কুয়া”। দুজনে মিলে ফল গুলোকে খতে লাগল কিন্তু ফলের বীজ গুলোকে তুলে রাখল যাতে নষ্ট না হয়। এই প্রথম তারা ‘তে কুয়া’ মানে তরমুজ খেল। পরের বছর সেই বীজগুলো পুতে আরও তরমুজ হল, এমন করে প্রচুর তরমুজ হলে পরে, আন তিয়েম বুদ্ধি করে দ্বীপের কাছ দিয়ে যে সমস্ত জাহাজ যেত, তাদের নাবিকদের কাছে ঐ তরমুজ বিক্রী করে তার বদলে তাঁদের যা যা দরকার তাই নিতে লাগল। তাঁদের আর কোন কষ্ট রইল না। একদিন আন তিয়েমের মাথায় একটা বুদ্ধি আচমকা এল। সে কিছু তরমুজের গায়ে তার নাম খোদাই করা সমূদ্রের জলে ভাসিয়ে দিল। তরমুজগুলো ভাসতে ভাসতে গিয়ে পৌছল রাজা মশাইয়ের দেশে। সেখান কার লোকেরা নতুন ধরণে কিছু সমূদ্রে ভাসছে দেখে তুলে নিয়ে এসে রাজামশাইয়ের কাছে হাজির। রাজামশাই দেখলেন ফলের গায়ে লেখা আছে আন তিয়েম। রাজামশাই চেচিয়ে উঠলেন আরে এটাতে তো আন তিয়েমের নাম লেখা আছে। তাহলে আন তিয়েম এখনো বেচে আছে। লোক পাঠিয়ে আন তিয়েমকে আর তার বউকে দেশে ফেরত নিয়ে আসা হল। সবাই সুখে থাকতে লাগল।

from Spicydilip http://ift.tt/1wYA6xU

via IFTTT